রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর
ভূমিকা
আধুনিক গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল একটি অপরিহার্য বিষয়। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক দল ছাড়া সম্ভব নয়। আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আলোচনা-সমালোচনার কারণেই আধুনিক সরকারব্যবস্থা প্রকৃত গণতন্ত্রের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনমূলক ভূমিকার জন্যই তাদের ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত।
![]() |
ছবি: রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য আলোচনা। |
রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য
রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এর নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে ওঠে।
১. জনসমাবেশ
রাজনৈতিক দল হচ্ছে জনগণের সমষ্টি। কোনো দেশের নাগরিকরা সমবেত হয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকরা একত্রিত হয়ে এক বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে।
২. মতাদর্শের ঐক্য
রাজনৈতিক দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সদস্যরা একই মতাদর্শের সমর্থক। রাজনৈতিক দল গঠিত হয় সমমতাদর্শে অনুপ্রাণিত, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অমিল হলেও মতাদর্শগত ঐক্য রাজনৈতিক দলের জন্য অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।
৩. সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি
প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি কর্মসূচির অধীনে দল ঐক্যবদ্ধ হয়। আর কর্মসূচি রূপায়ণে দলগুলো নিয়মতান্ত্রিক ও সংবিধানসম্মত পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়।
৪. জাতীয় স্বার্থ
রাজনৈতিক দলের সার্বিক কর্মকাণ্ড জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্যশীল হয়। এটি একটি সর্বজনীন সংস্থা এবং তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে সবার জন্য অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থ সাধনে কাজ করবে। সর্বপ্রকার সংকীর্ণতা, আঞ্চলিকতা, শ্রেণীস্বার্থ ও বৈষ্যম্যের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক দল কাজ করে।
৫. নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কার্যক্রম সম্পাদন
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন কর্মসূচি থাকে। সরকার গঠন ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দলগুলো নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কার্যক্রম সম্পন্ন করে।
৬. জনমত গঠন
প্রার্থী মনোনয়ন এবং নির্বাচনি যুদ্ধে বিজয়ী হবার জন্য ব্যাপক প্রচার কাজে অংশগ্রহণ করে। দেশ ও দেশবাসীর সমসাময়িক সমস্যাবলি সম্পর্কে অবিরাম আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সকল দলই নিজ মতাদর্শের অনুকূলে জনমত গঠনের চেষ্টা করে।
৭. ক্ষমতা দখলের প্রয়াস
নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক বা সরকারি ক্ষমতা দখলের প্রয়াস রাজনৈতিক দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটি রাজনৈতিক দলের প্রতিযোগিতামূলক ও নিরন্তন প্রচেষ্ঠা।
৮. সরকার গঠন
রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া। কেননা বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠনের দায়িত্ব পায়।
৯. রাজনৈতিক একক
রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা থাকে। সকলে মিলে কার্যপদ্ধতিতে এমন পথে গঠিত ও পরিচালিত হন, যেন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক এককে পরিণত হতে পারেন। দলীয় কর্মীগণ রাজনৈতিক এককে পরিণত হবার পর দলীয় স্বার্থে কাজ করে থাকে।
১০. মুষ্টিমেয়র অমোঘ বিধান
রাজনৈতিক দল বিরাট জনগোষ্ঠী ও ব্যাপক সংখ্যক সদস্য দিয়ে সংগঠিত হয়। তাই দলের সিদ্ধান্ত সকল সদস্যের সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। কিন্তু দলের মুষ্ঠিমেয় ক'জনের আধিপত্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও নিয়ন্ত্রণ থাকে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মিচেলস কোনো ব্যক্তির এ কর্তৃত্বকে Eron law of oliger chy বা মুষ্টিমেয়র অমোঘ বিধান বলে আখ্যায়িত করেছেন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, উল্লিখিত দিকগুলোই রাজনৈতিক দলের মৌলিক বা অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও রাজনৈতিক দলের কতিপয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন- কেবল নাগরিকগণই দল গঠন করার অধিকার রাখে। বিদেশিগণের কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার নেই। দলীয় কর্মকাণ্ড নিজ দেশের মধ্যে আবদ্ধ থাকে; অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলো আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাস স্থাপন করে। সর্বোপরি গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব রয়েছে।