অনুচ্ছেদ: একটি শীতের সকাল

 একটি শীতের সকাল 


আজ বাংলা পৌষ মাসের ১৬ তারিখ। জানুয়ারির এই সময়টাতে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের প্রায় সব জায়গাতেই কমবেশি খুবই শীত পড়ে। যদিও পৌষ মাসের শীতে ঠক ঠক করে কাপার কথা। কিন্তু আমার গায়ে শুধুমাত্র পাতলা একটা জামা। তেমন শীত লাগছে না। কারন আমি শহরের একটি আবাসিক এলাকায় বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। গ্রামের মতো শীত এখানে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। শহরের বড় বড় দালান কোঠা পাকা সড়ক গাড়ীঘোড়া বিদ্যুতের বাতি আর কল কারখানার ভিড়ে শীতের প্রকোপ তেমন বোঝা যায় না। "পৌষের শীত তুষের গায়"/ "মাঘের শীতে বাঘ পালায়" এই প্রবাদের শীত এখানে নেই। সোয়েটার, জ্যাকেট, কোট, টাইয়ের ভিড়ে এখানে শীত যেন ম্রিয়মাণ। শীতের সকালের আমেজ এখানে নতুন শাকসবজি আর হালফ্যাশনের গরম কাপড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বাংলা অনুচ্ছেদ: একটি শীতের সকাল
একটি শীতের সকাল 


গত শীতে আমি নানার বাড়ি দেবগ্রামপুর গিয়েছিলাম। বাস, রিকশা তারপর হাঁটা পথে যেতে যেতে বিকালে নানার বাড়ি পৌঁছলাম। পরদিন ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে মামা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। লেপের ভেতর থেকে চোখ ঢলতে ঢলতে উঠে দেখি চাদর গায়ে দেওয়া মামা আমার ঠকঠক করে কাঁপছেন। মামা বললেন চলো মন্টুদের গাছ থেকে আজ খেজুরের রস নামাবো। আমি মহা আনন্দে লাফ দিয়ে উঠলাম। 

উঠোনে নামতেই দেখি নানীজান মাটির চুলায় ভাপা পিঠা বানাচ্ছেন। চারিদিকে খেজুর রসের মৌ মৌ গন্ধ। আমার জীবে প্রায় পানি এসে গেল। মামার সাথে সাথে বাড়ির বাইরের দিকে গেলাম। কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে সব। পুকুরের হিম শীতল জলে মুখ ধুলাম। তারপর গেলাম মামার সাথে খেজুর রস নামাতে। 


বাড়ির সীমানা ঘেঁষে বেশ কয়েকটা খেজুর গাছ। তাতে এ সময় প্রচুর রস হয়। মামা খুব সাবধানে কোমরে বাঁধা টোকাতে ঝুলিয়ে রসভর্তি মাটির কলসি গুলো একে একে নামালেন। ছাকনি দিয়ে ছেকে রসগুলো ঢাললেন একটা বড় গামলায়। গ্লাসে ভরে আমাকে দিলেন এক গ্লাস কাচা রস। দাঁত অবশ হয়ে যাওয়ার মত শীতল কিন্তু অপূর্ব স্বাদ। খেজুর রস খেয়ে আমার শীত যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আমি ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলাম। মামা আমার অবস্থা দেখে হেসে উঠলেন। গ্রামের পথ ঘাট কুয়াশার চাদরে ঢাকা। মেঠোপথে কৃষক লাঙ্গল কাঁদে গরু নিয়ে যাচ্ছে হাল চাষে। কুয়াশার মধ্য তাদের আবছা ছায়ামূর্তি দেখা যায়। যেন কোন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক সুন্দর মনোরম ছবি। 

পূর্ব দিকে আবির ছড়িয়ে সূর্য উঠছে ডিমের কুসুমের মত। সবুজ ঘাসে ছড়ানো শিশির গুলোকে মুক্তোর মত লাগছে। খালিপায়ে শিশির সিক্ত সবুজ ঘাসে হাঁটতে গিয়ে আমার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভিজে গেল। কিন্তু হিম শীতল শিশিরের স্পর্শ পেয়ে আমার মন আনন্দে নেচে উঠলো। 

বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম পুকুরের পানির থেকে দোয়া উঠছে। উঠোনের একপাশে তখন রোদ এসেছে। সেখানে পার্টি বিছিয়ে নানীজান ভাপা পিঠা আর কাঁচা রসের পায়েস খেতে দিলেন। অপূর্ব তার স্বাদ। শীত সকালের এমন শুভঙ্কর অনুভূতি আমি এর আগে আর কখনো পাইনি। আবহমান বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্য লালিত এই গ্রামীণ জীবনের শীতের সকাল উপভোগ করে আমি ধন্য। 

শহরের বাসায় ডাইনিং টেবিলে বসে ডিম মামলেট রুটির টোস্ট কিংবা পরোটা বাজিয়ে নাস্তায় সেই স্বাদ কোথায়? আমাদের আবাসিক এলাকায় বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভোরের সূর্যোদয় দেখতে দেখতে আমি আনমনা হয়ে যাই। বাহিরে তখন প্রাণের সারা পড়েছে। ছোট্ট ছেলে মেয়েরা স্কুল ড্রেস পরে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। শহরের শীতের সকালের মধ্যে সেই প্রাণ স্পন্দন কোথায়? আমার বুক থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। মনে হলো আজকের এই শীতের সকালে যদি আমার নানি বাড়িতে থাকতে পারতাম! 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

Next Post Previous Post