গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থা কি অপরিহার্য? পর্যালোচনা কর
ভূমিকা
রাজনৈতিক দলব্যবস্থা গণতন্ত্রের প্রাণস্বরূপ। বর্তমান বিশ্বের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক রাষ্টে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশালায়তন আধুনিক রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ জনসাধারণ প্রত্যক্ষভাবে শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করতে পারে না। দলীয় ব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা শাসনকার্য পরিচালনায় পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। সুতরাং রাজনৈতিক দল ব্যতীত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা কল্পনা করা যায় না।
![]() |
ছবি: গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থা কি অপরিহার্য? |
গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থা অপরিহার্য কি-না?
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। অধ্যাপক বার্কারের মতানুসারে গণতন্ত্রকে গ্রহণ করলে দলীয় ব্যবস্থাকেও গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে। দল ব্যবস্থা ব্যতীত প্রতিনিধিমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের বহুবিধ কার্যাবলির গুরুত্ব তার অস্তিত্বের অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে। নিম্নে গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থা যে অপরিহার্য তা আলোচনা করা হলোঃ
১. প্রতিনিধি নির্বাচন
সহজ হয় গণতন্ত্রে প্রতিনিধি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এ প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় দলীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে। দলব্যবস্থার ভিত্তিতে জনগণের পক্ষে নির্বাচনে প্রতিনিধি বাছাই করা সহজতর হয়। ভোটদাতার পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক নির্বাচন প্রার্থীর গুণগত যোগ্যতা, মতাদর্শ, নৈতিক চরিত্র প্রভৃতি নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। দলপ্রথার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে অসংখ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অল্পসংখ্যক প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এর ফলে দলের আদর্শ ও কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে পছন্দমতো প্রতিনিধি নির্বাচন করা নির্বাচকদের পক্ষে সহজসাধ্য হয়।
২. শ্রেষ্ঠ নীতি ও কর্মপন্থার উদ্ভব
গণতন্ত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দল দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করে। তার মধ্যে রাজনৈতিক দল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোকে বাছাই করে এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রচার করে। এভাবে নির্বাচনী প্রচারের সময় দেশের বিভিন্ন সমস্যা এবং তার সমাধান সম্পর্কে নীতি ও কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে বাদানুবাদ হয় তার ফলে সর্বশ্রেষ্ঠ কর্মপন্থার উদ্ভাবন সম্ভব হয়। এই নীতি ও কর্মপন্থা অনুসারে দেশ পরিচালিত হলে রাষ্ট্রের দ্রুত উন্নয়ন সাধিত হয়।
৩. প্রতিনিধিদের মধ্যে সংহতির সৃষ্টি
প্রতিনিধিমূলক শাসনব্যবস্থায় শাসনকার্য পরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কে অধিকাংশ প্রতিনিধির ঐকমত্য আবশ্যক। তা না হলে শাসনকার্যে বিশৃঙ্খলতা দেখা দিতে পারে। দলব্যবস্থা প্রতিনিধিদের মধ্যে মতৈক্যের সৃষ্টি করে। তার ফলে সরকার সুসংহতভাবে ও সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালিত হয়।
৪. রাজনৈতিক শিক্ষা ও চেতনার বিকাশ
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলো জনসাধারণের রাজনৈতিক শিক্ষা ও চেতনার বিস্তার ঘটায়। দলগুলো সমাজের অসংখ্য সমস্যা ও তার সমাধানের ব্যাপারে আলোকপাত করে। নিজ নিজ দলীয় নীতি ও পরিকল্পনার সমর্থনে যুক্তি ও তথ্য প্রচার করে। এর ফলে জনগণ রাষ্ট্রীয় সমস্যাবলি এবং বিভিন্ন দলের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাফল্যের স্বার্থে জনগণের এই রাজনৈতিক চেতনা অপরিহার্য।
৫. স্বৈরাচারিতা রোধ
গণতন্ত্রে দলব্যবস্থার মাধ্যমে স্বৈরাচারের পথ রুদ্ধ হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দল বিরোধী দলের সমালোচনার ভয়ে স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না। সরকারি দলের কার্যকলাপ ও ত্রুটি-বিচ্যুতির উপর বিরোধী দল সতর্ক দৃষ্টি রাখে। বিরোধী দল সমালোচনার মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাদের স্বপক্ষে জনমতকে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। এর ফলে জনসমর্থন হারিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে সরকারি দলের পরাজয়ের আশঙ্কা থাকে। সরকারি দল সদা সতর্ক থাকে যাতে বিরোধী দল কোনো রকম সমালোচনার সুযোগ না পায়। এ কারণে দলব্যবস্থাকে স্বাধীনতার অন্যতম রক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৬. আইন ও শাসন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতার সৃষ্টি
সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে পরিপূর্ণ সহযোগিতা ছাড়া সুশাসন সম্ভব নয়। দলীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে উভয় বিভাগের মধ্যে প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যায়। আইনসভার সংখ্যাগরিদ দলই সরকার গঠন করে। ফলে উভয় বিভাগের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এর ফলে প্রশাসনিক উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়। তাই বলা হয় যে, ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির ত্রুটিগুলো দলীয় ব্যবস্থায় সংশোধিত হয়।
৭. সরকারের স্থায়িত্ব রক্ষা
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের স্থায়িত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণতন্ত্রে দলপ্রথার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করে। ফলে সরকারের পেছনে সর্বদা পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন বজায় থাকে। স্থায়িত্বের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা থাকে না। তাই সরকারও সুশাসন ও জনকল্যাণ সাধনে পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করতে পারে।
৮. শান্তিপূর্ণভাবে সংস্কার সাধন
গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভৃতি পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দল ঘোষিত নীতি অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনমত অনুমোদিত সংস্কার সাধন করে। আবার সরকারি দলের কার্যকলাপে জনগণ সন্তুষ্ট না হলে পরবর্তী নির্বাচনে সরকারেরও পরিবর্তন সাধন করতে পারে। এভাবে সরকারেরও পরিবর্তন, শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে করা যায়। দলব্যবস্থা না থাকলে সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সামরিক অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের আশঙ্কা থাকে।
৯. জনমত গঠন ও প্রকাশ
দলব্যবস্থা জনমত গঠন ও প্রকাশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে। সংবাদপত্র, সভাসমিতি ও অন্যান্য উপায়ে দলীয় প্রচার চালানো হয়। এর ফলে জনগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে অবহিত হয় এবং নিজ নিজ মতামত গঠন করে। নির্বাচনের পূর্বে জনসমর্থের গতি-প্রকৃতি অনুসারে জনমত প্রকাশিত হয়। দলীয় প্রতিনিধির মাধ্যমেও এর প্রকাশ ঘটে।
১০. গণতন্ত্রের স্বরূপ সংরক্ষণ
গণতন্ত্রকে জনমতের অনুগামী শাসনব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনপ্রাপ্ত সরকারি দল জনমতকে বাস্তবে রূপায়িত করার ব্যাপারে আত্মনিয়োগ করে। এভাবে রাজনৈতিক দল জনমত গঠন ও প্রকাশে সহায়তা করে এবং গণতান্ত্রিক স্বরূপও বজায় রাখে।
১১. রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ
রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ভোটদাতাদের রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। প্রত্যেক নির্বাচকের নাম যাতে তালিকাভুক্ত হয় সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নজর রাখে। তাছাড়া ভোটগ্রহণ, ভোটগণনা প্রভৃতি যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয় সেসব বিষয়েও রাজনৈতিক দলগুলো প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে।
১২. সরকার ও জনগণের মধ্যে সংযোগ সাধন
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলো সরকার ও জনগণের মধ্যে সংযোগ রক্ষার দায়িত্ব পালন করে থাকে। জনগণের অভাব-অভিযোগের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে অবহিত করে এবং জনগণের সমস্যাদির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই সমস্ত সমস্যাদির সমাধান এবং অভাব-অভিযোগের নিরসনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে জনস্বার্থ সংরক্ষণে সরকারকে বাধ্য হতে হয়।
উপসংহার
উল্লিখিত আলোচনা হতে এটা স্পষ্ট যে, গণতন্ত্রের স্বার্থে রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব অপরিহার্য। আধুনিক রাষ্ট্র দলভিত্তিক রাষ্ট্র। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের ফলে প্রতিটি দেশেই নাগরিকগণ উত্তরোত্তর রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠেছে। একে একটি সুবিন্যস্ত রূপ দেবার প্রয়োজনে গণতন্ত্রে রজনৈতিক দল অপরিহার্য। সুতরাং বর্তমান সময়ে স্বাধীন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নিতান্তই স্বাভাবিক ও অপরিহার্য।