গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব আলোচনা কর
ভূমিকা
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক গণতন্ত্র হলো পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র। আর প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মূলভিত্তিই হলো রাজনৈতিক দল। প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রে কার্যত রাজনৈতিক দলই সরকার পরিচালনা করে। যে কারণে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে দলীয় ব্যবস্থা সর্বজনীন স্বীকৃতি অর্জন করেছে। সুতরাং গণতান্ত্রিক সরকার ও রাজনৈতিক দল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
![]() |
ছবি: গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব। এডুকেশন বিডি ব্লগ। |
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল বহুবিধ কার্যাবলি সম্পাদন করে। নিম্নে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো।
১. জনমত গঠন
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল জনমত গঠনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সভা-সমিতি, পত্র-পত্রিকা, বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নীতি ও কর্মসূচির সমর্থনে জনমত গঠনের চেষ্টা করে। লাওয়েল (Lowell)-এর মতে, "জনমতকে সকলের সামনে উপস্থাপন করে জনগণের রায় গ্রহণের উপর্যুক্ত কর্মসূচি প্রণয়ন করা রাজনৈতিক দলের অন্যতম লক্ষ্য।"
২. জনগণের প্রতিনিধিত্ব
গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসনব্যবস্থা। বাস্তবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিগণই শাসনকার্য পরিচালনা করে। সুতরাং গণতন্ত্রে দলীয় ব্যবস্থা অপরিহার্য। আবার প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে দলীয় শাসনও বলা হয়। রাজনৈতিক দলের কোনো সদস্য আইনসভায় নির্বাচিত হলে তিনি নিজ এলাকার সমস্যাবলি আইনসভায় তুলে ধরেন এবং সেগুলো সমাধানের জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যান। তাছাড়া সরকারদলীয় সদস্য সরকারের কাছে নিজ এলাকার সমস্যাবলি তুলে ধরেন এবং সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করেন।
৩. সরকার গঠন ও পরিচালনা
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনে অনেক রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো নিজ দলের প্রার্থীদের সপক্ষে প্রচারকার্য চালায়। নির্বাচন শেষে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সেই দল সরকার গঠন করে। সুতরাং গণতান্ত্রিক সরকার হলো একটি দলীয় সরকার। সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক দল শাসনকার্য পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. সরকার পরিবর্তন
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। ফলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। সরকার পরিবর্তনের জন্য বিপ্লব বা কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির প্রয়োজন হয় না। শুধু পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। নির্বাচনে জয়লাভ করলে বিরোধী দল সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করে। এভাবে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার পরিবর্তন করা যায়।
৫. রাজনৈতিক শিক্ষাদান
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল জনগণকে রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে রাজনৈতিক বিষয়াদি এবং বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তাছাড়া বিরোধী দল সরকারের নীতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে দোষ-ত্রুটি তুলে ধরে। জনগণ এসব আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক জ্ঞান অর্জন করে থাকে।
৬. জনগণ ও সরকারের সেতুবন্ধ
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল জনগণ ও সরকারের সেতুবন্ধ রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত আইনসভার সদস্যগণ তাদের নিজ এলাকার জনগণের দাবি-দাওয়া ও সমস্যাবলির কথা সরকারকে জানায় এবং সরকার সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করে। তাছাড়া রাজনৈতিক দল জনগণকে সরকারের নীতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করে তোলে। জনগণ সরকারি ও বিরোধী দলের বক্তব্য শুনে উভয়ের নীতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত হয়।
৭. স্বৈরাচারিতা রোধ
গণতন্ত্রে সরকারি দল ও বিরোধী দলের অস্তিত্ব থাকে। বিরোধী দল সরকারের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে। সুতরাং বিরোধী দলের সমালোচনার ভয়ে সরকার স্বৈরাচারী আচরণ করতে পারে না। বিরোধী দল সরকারের নীতি ও কর্মসূচির সমালোচনার মাধ্যমে জনমতকে তাদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে। অধ্যাপক লাঙ্কি (Laski) বলেন, "দেশে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার রক্ষাকবচ হলো রাজনৈতিক দল।"
৮. গণতন্ত্রের স্বরূপ বজায় রাখা
রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের স্বরূপ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণতন্ত্রের সফলতার জন্য একাধিক রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলভিত্তিক হলো দলীয় ব্যবস্থা আর রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে তার প্রাণ। লর্ড ব্রাইন বলেন, "রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য এবং প্রত্যেক বৃহৎ, স্বাধীন রাষ্ট্রেই তাদের অস্তিত্ব বিদ্যমান।"
৯. রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
রাজনৈতিক দল জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক দল জাতীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে জনগণকে সম্পৃক্ত করে অংশগ্রহণ সম্প্রসারিত করে। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থীদের সপক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ফলে জনগণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
১০. বিকল্প সরকারের ভূমিকা পালন
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোট সরকার গঠন করে এবং অন্যান্য দল বা জোট বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধী দলের মূল ভূমিকা হলো সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করা। সরকারি দল যাতে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে না পারে বিরোধী দল সেদিকে সজাগ থাকে। এসব কারণে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে বিকল্প সরকার হিসেবে অভিহিত করা হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক দল একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি ছাড়া আরেকটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডি. ও. কি (V.O. Key) বলেন, "রাজনৈতিক দল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।"