গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের শর্তাবলি

অথবা, 

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের শর্তসমূহ বর্ণনা কর


ভূমিকা

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল অপরিসীম ভূমিকা পালন করে গণতন্ত্রকে অর্থবহ করে তুলতে হলে রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায় না। তাই গণতন্ত্রে একাধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে এক দলীয় ব্যবস্থায় কখনোই গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করা যায় না। কিন্তু বহুদলীয় ব্যবস্থায় সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকে। সুতরাং গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলকে স্বার্থক বা সফল করে তুলতে হলে বেশ কিছু শর্ত মেনে চলতে হয়।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের পূর্বশর্ত
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের শর্তগুলো লেখ?


গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের শর্তাবলি আলোচনা 

নিম্নে গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের শর্তাবলি আলোচনা করা হলোঃ

১. সহনশীলতা 

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো সহনশীলতা বা পরমতসহিষ্ণুতা। আর আধুনিক গণতন্ত্র হলো প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র। আর রাজনৈতিক দল হলো প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের প্রাণ। সে জন্য গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সফল হতে হলে অবশ্যই দলের মধ্যে সহনশীলতা বা সহিষ্ণুতামূলক মনোভাব থাকা একান্ত প্রয়োজন। সহিষ্ণুতামূলক মনোভাব না থাকলে সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ থাকতে পারে না। অপরের পথ এবং মত গ্রহণযোগ্য না হতে পারে, তবে সে পথ এবং মতকে সহ্য করার মতো মন-মানসিকতা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের থাকা প্রয়োজন।

২. পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ 

রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন নিজ দলের আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের অধিকার রয়েছে ঠিক তেমনিভাবে অন্য দলকে তাদের আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে। এভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। অপরকে সহ্য করার মতো মানসিকতা না থাকলে, নিজ দলের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

৩. অসাম্প্রদায়িকতা

দেশের বিভিন্ন স্বার্থকামী গোষ্ঠীর ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গড়ে উঠে। ধর্মের উপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গড়ে উঠলে তা দেশের জন্য ভালো হয় না। এ ধরনের দলের মধ্যে সংকীর্ণতা দেখা দেয়, যা সামগ্রিক স্বার্থের জন্য কল্যাণকর নয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক দলকে অসাম্প্রদায়িক হতে হবে।

৪. জাতীয় স্বার্থ রক্ষা 

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের জন্য একে জাতীয় স্বার্থের ধারক ও বাহক হতে হবে। অর্থাৎ "রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ ও লক্ষ্য হবে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া এবং সংরক্ষণ করা। এ উদ্দেশ্য সাধনকল্পে সর্বপ্রকার ব্যক্তি স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে হবে। কেননা ব্যক্তি থেকে দল বড়, দলের থেকে জাতি বড়।"

৫. যোগ্য ও আদর্শ নেতৃত্ব 

গণতন্ত্রকে সাফল্যমণ্ডিত করতে যোগ্য ও আদর্শ নেতৃত্ব আবশ্যক। দেশে সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য গতিশীল, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও আদর্শ নেতৃত্ব প্রয়োজন। সৎ, আদর্শ, জাতীয় কল্যাণে ব্রতী এবং ঐক্যবদ্ধ ও অটুট নেতৃত্ব ছাড়া রাজনৈতিক দল সুসংগঠিত ও শক্তিশালী হয় না। গতিশীলতার পাশাপাশি নেতাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্নও হতে পারে।

৬. সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতা

সামরিক বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃঙ্খলা এবং বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। অনুন্নত দেশে সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট হয়ে কিছু রাজনৈতিক দল গড়ে উঠে। অনেক সময় সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাবৃন্দ সুযোগমতো ক্ষমতা দখল ও রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার প্রয়াস চালায়। ঐসব দলের প্রতি থাকে সেনাবাহিনীর গোপন সমর্থন। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের জন্য সামরিক বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

৭. বিদেশি প্রভাবমুক্ত 

গণতন্ত্রকে সফল করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই বিদেশের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আদর্শগত বা অন্য কোনো কারণে যাতে বিদেশি শক্তি লেজুড়বৃত্তি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে হাত পাতার মানসিকতা ত্যাগ করবে। নিজ দেশের রাজনীতিতে বিদেশি রাষ্ট্রের নাক গলানোর ক্ষেত্রে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। সকল প্রকার সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করতে হবে।

৮. সময়োপযোগী দল সৃষ্টি

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলকে চলতে হবে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে। সময়ের বিরোধী হওয়া সমীচীন হবে না। রাজনৈতিক দল হবে যুগের সৃষ্টি। তাছাড়া মানুষের মেজাজ-মর্জি অনুযায়ী নীতি আদর্শ নির্ধারণ করতে না পারলে রাজনৈতিক দল চলতে পারে না। দেশে সময়োপযোগী দলের সৃষ্টি না হলে ঝামেলার সৃষ্টি হতে পারে। তাই গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের জন্য ডিজরেইলি (Disraily) সময়োপযোগী দল সৃষ্টির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

৯. সুসংগঠিত দলব্যবস্থা

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের জন্য সুসংগঠিত দলব্যবস্থা থাকতে হবে। দলের গঠন-কাঠামো সমগ্র দেশব্যাপী বিস্তৃত হতে হবে। অনেক সামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল থাকে যা কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এ সকল দল প্রকৃত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দল নয়। শক্তিশালী বা বড় দলের লেজুরবৃত্তি করাই এ সকল দলের কাজ। কিন্তু প্রকৃত ও যোগ্য দল হতে হলে দলের গঠন কাঠামো দেশের সর্বত্র থাকতে হবে এবং দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে, দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করতে হবে এবং দলের নিজস্ব সংবিধান থাকতে হবে।

১০. আলাপ-আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সাফল্যের একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি। রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় সমস্যা বা দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরসনে এক টেবিলে আলোচনায় বসতে হবে এবং ঐকমত্যে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে হবে। এস, এম, লিপসেট (S. M. Lipset) বলেন, "জাতীয় মৌলিক প্রশ্নে দলের ঐকমত্যে আসা দরকার। আর সে জন্য আলোচনা করেই তা স্থির করতে হবে।" অধ্যাপক লাস্কি বলেন, "যে সমাজে আলোচনার সুযোগ আছে, সেখানে যুদ্ধ করার প্রয়োজন হয় না।" সুতরাং গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের সাফল্যের জন্য আলাপ-আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায় যে, রাজনৈতিক ব্যবস্থার অগ্রগতির সাথে গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংরক্ষণে দল সক্রিয় এবং গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক দল যেমন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংরক্ষণ ও স্থায়িত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, গণতন্ত্রের ব্যর্থতায়ও তার ভূমিকা কম নয়। বহু রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব, দলীয় সংগঠনের দুর্বলতা, মতাদর্শ ও কর্মসূচিগত সংহতির অভাব, জনসাধারণের দাবির প্রতি তীব্র অনীহা এবং অবজ্ঞার মনোভাব দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বহু দেশেই গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করেছে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

Previous Post